Background

বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড: সূচনা, সংগ্রাম ও এগিয়ে চলার গল্প

বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি উপলব্ধি থেকে—বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে হলে সফটওয়্যারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই মান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স প্রফেশনালস।

এই উদ্যোগের সূত্রপাত ২০০৫ সালে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। তাঁর সঙ্গে আসা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য ছিলেন প্রফেসর ড. বার্ন্ড হিন্ডেল।

জার্মান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি টাস্কফোর্সের সদস্য ড. মোঃ সবুর খান অংশ নেন। তিনি সেখানে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।

বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রফেসর হিন্ডেল তাঁকে বলেন, বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সফটওয়্যার কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এই কাজে সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ড. খান জানতে চান, এ ক্ষেত্রে কীভাবে এগোনো যায়। প্রফেসর হিন্ডেল তাঁকে দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। একটি বেলজিয়ামে রেজিস্টার্ড গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ISTQB-International Software Testing Qualifications Board; অন্যটি জার্মানিভিত্তিক iSQI—International Software Quality Institute।

ওই বৈঠকের পর পরই ড. খান ড্যাফোডিলের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামানকে ফোন করেন, প্রতিষ্ঠান দুটির ওয়েবসাইট দেন এবং সেগুলো দেখে একটি রিপোর্ট দিতে বলেন। আমি অনুসন্ধান করে তাঁকে জানাই, ISTQB-এর সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটির কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারি। আর iSQI-এর সঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

সব শুনে ড. মোঃ সবুর খান সংক্ষেপে বললেন, “Go ahead.”!

সেই নির্দেশনা থেকেই আমাদের কাজ শুরু।

প্রস্তুতির সময় ড. নূরুজ্জামান Indian Testing Board-এর কথা জানতে পারে। তখন এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিঃ ভিপুল কোচার। ড. নূরুজ্জামান মিঃ কোচার সঙ্গে যোগাযোগ করে ড. খানকে বলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে ভারতে গিয়ে সরাসরি আলোচনা করা প্রয়োজন।

ড. মোঃ সবুর খান ও ড্যাফোডিলের সহায়তায় ড. নূরুজ্জামান নয়ডা, ইন্ডিয়া গিয়ে ভিপুল কোচারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বোর্ড কীভাবে পরিচালিত হয়, সদস্যপদের জন্য কী প্রস্তুতি প্রয়োজন এবং বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কীভাবে শুরু করা যায়—এসব বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন। সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের বইপত্র সংগ্রহ করেও দেশে ফিরেন।

ফিরে এসে ড. মোঃ সবুর খানকে রিপোর্ট করেন এবং বলেন, বাংলাদেশের একাডেমিয়া, সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি ও পেশাজীবীদের নিয়ে একটি উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ISTQB-এর General Assembly-তে উপস্থাপন করতে হবে।

ড. খান আবারও এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। 

সংবাদপত্রে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে ড. নূরুজ্জামান একটি সভা আহ্বান করেন। ড্যাফোডিল প্লাজা’র ষষ্ঠ তলায় ৬০৩ নম্বর কক্ষে অনুষ্ঠিত সেই সভায় ৮৪ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে গভঃ, ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীরা ছিলেন।

অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ড. নূরুজ্জামান উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেন। আলোচনা শেষে সর্বসম্মতভাবে ড. রহমানকে সভাপতি এবং ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামানকে সদস্যসচিব করে ১১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সংগঠনের নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেষ্টিং বোর্ড (বিএসটিবি)। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বেসিস, বিসিসি, বিসিএস, পিএটিসি, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই কমিটিতে যুক্ত হন।

এরপর শুরু হয় আন্তর্জাতিক সদস্যপদের প্রস্তুতি।

২০০৬ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোতে ISTQB General Assembly (GA) অনুষ্ঠিত হয়। ড. নূরুজ্জামান সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন—আমরা কেন এই উদ্যোগ নিতে চাই, কীভাবে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করব এবং বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পের মানোন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখব।

ড. নূরুজ্জামান বলেন, সেই সভায় ১৭টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। প্রেজেন্টেশনের পর ভোটাভুটি হয় এবং বাংলাদেশ ১৪টি সমর্থনসূচক ভোট পায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ২৮তম সদস্যদেশ হিসেবে ISTQB-এর সদস্যপদ অর্জন করে।

এটি ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও আনন্দের একটি অর্জন।

এই প্রস্তুতি ও সদস্যপদ অর্জনের পেছনে ড্যাফোডিল ও এর চেয়ারম্যান ড. মোঃ সবুর খানের উৎসাহ, নির্দেশনা এবং আর্থিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের ব্যয় তিনি বহন করেন।

তবে সদস্যপদ অর্জনের পর বোর্ডকে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা সহজ হয়নি। 

অরল্যান্ডো থেকে ফিরে আহ্বায়ক কমিটির সভা ডাকা হয়। প্রথম সভায় চার-পাঁচজন উপস্থিত থাকলেও পরবর্তী সভাগুলোতে অংশগ্রহণ কমে যায়। উদ্যোগটির শুরুতে ব্যয় ও সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল বেশি; তাৎক্ষণিক আয় বা প্রত্যক্ষ সুবিধার সুযোগ ছিল ছিল না। ফলে সম্মিলিত কার্যক্রম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। 

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের জরুরি অবস্থা এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি। কয়েক বছর আমাদের কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক সভায় অংশগ্রহণ ছিল না। এক পর্যায়ে ISTQB-তে বাংলাদেশের বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তা এবং সদস্যপদ অব্যাহত রাখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 

২০০৯ সালে দিল্লির General Assembly(GA)-তে সেই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয়। জরুরি অবস্থা, সরকার পরিবর্তন এবং উদ্যোগটির প্রাথমিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশামতো কাজ করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আমরা তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হই যে বাংলাদেশে এই উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে এবং আমরা কাজ এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সেই দিল্লি সভায় ভিপুল কোচারের সঙ্গে আবার আলোচনা করি। তাঁকে বাংলাদেশে এসে সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনার অনুরোধ জানাই। তিনি সম্মত হন।

২০০৯ সালের শেষের দিকে তাঁর অংশগ্রহণে আমাদের প্রথম Foundation Level প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ব্যাচে ১৭ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন ছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এবং তিনজনকে ড্যাফোডিল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

সেই ব্যাচ থেকে প্রথম নয়জন আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জন করেন। আনন্দের বিষয়, ড্যাফোডিলের তিনজন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে দুজন সফল হন।

এভাবেই বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ডের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ড্যাফোডিল এই কার্যক্রম এগিয়ে নেয়।

আমাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি ছিল—শুধু বেসরকারি উদ্যোগ দিয়ে এই ক্ষেত্রকে বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটির গুরুত্ব বুঝতে হবে।

সেই চিন্তা থেকে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি ISTQB General Assembly-তে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিই। ড্যাফোডিলের অর্থায়নে বিসিসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক এবং প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক সেখানে অংশ নেন।

তাঁরা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি কার্যক্রমের পরিসর সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পান।

সফরের পর বিসিসি সফটওয়্যার টেস্টিং ও সার্টিফিকেশনের জন্য একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে Software and Hardware Quality Testing and Certification (SHQTC) Center প্রতিষ্ঠিত হয়। বিসিসির প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর প্রশিক্ষণে ড্যাফোডিল ভূমিকা রাখে। এটি ছিল আমাদের পথচলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

আন্তর্জাতিক সদস্যপদ ও যোগাযোগ ধরে রাখার কাজও চলতে থাকে।

General Assembly-তে নিয়মিত অংশগ্রহণের জন্য অর্থের প্রয়োজন হতো। ড. নূরুজ্জামান ISTQB-এর Process Working Group (WG)-এর সদস্য। সেই WG সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সভায় অংশগ্রহণের জন্য ISTQB’র নিয়ম অনুযায়ী পাওয়া আর্থিক সহায়তা, ড্যাফোডিলের অবদান এবং ব্যক্তিগত উৎস মিলিয়ে বিভিন্ন সময়ে General Assembly-তে অংশ নিয়েছেন।

এভাবে বিএসটিবি’র আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ধরে রাখা হয়েছে।

দীর্ঘ এই পথচলায় ড্যাফোডিলের ধারাবাহিক সহায়তা উদ্যোগটিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে আমরা বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফায়েড সফটওয়্যার টেস্টিং পেশাজীবী তৈরির কাজে অবদান রাখতে পেরেছি। ক্যাশ, মেধা, ও সময়ের অর্থমূল্যে এটা কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।

আজ বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড সরকারিভাবে রেজিস্টার্ড ও আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত অবস্থানে এসেছে। 

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে Software Quality Assurance and Testing-এ মেজর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একাধিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে নিয়ে আমাদের একটি নির্বাহী কমিটিও কাজ করছে।

বিএসটিবি’র উদ্দেশ্য হলো দক্ষ মানুষ তৈরি করা, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কোয়ালিটির চর্চা বাড়ানো এবং বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও সেবাকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সহায়তা করা।

২০০৫ সালের একটি আলোচনা থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা বহু মানুষের সহযোগিতা, ব্যক্তিগত শ্রম এবং ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় আজকের অবস্থানে এসেছে।

এই উদ্যোগের সূচনায় ড. মোঃ সবুর খানের উৎসাহ, গাইডেন্স ও আর্থিক মানুষিক সহায়তা, ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামান এর উদ্যোগী ভূমিকা ও অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমানসহ প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।

আমাদের সামনে এখন আরও বড় দায়িত্ব—বাংলাদেশে সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্সকে আরও বিস্তৃত করা এবং বিশ্বমানের সফটওয়্যার শিল্প গড়ে তোলার কাজে অবদান রাখা।

ধন্যবাদ।